মাইক্রো ফ্র্যাঞ্চাইজিং : দুগ্ধজাত খাদ্যে বিষক্রিয়া রোধে ক্ষুদ্র অথচ কার্যকর সমাধান

লপ্রতিবেদক : সুমাইয়া নেহলা সাইফ, অনুবাদ : নাঈমা মাহফুজা
Dhaka, 1 October 2015
পশ্চিমা রীতি অনুসরণ করে বাংলাদেশীরা দিনদিন স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভাস সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠছে। স্বাস্থ্যরক্ষায় পুষ্টিকর খাবার গ্রহণে তাদের সচেতনতা প্রশংসনীয়। তা সত্ত্বেও তাদের মধ্যকার খুব অল্প কয়েকজন ই খাদ্যে বিষক্রিয়া সম্পর্কে জানে। আর জানলেও তাদের নিত্যকার জীবনে এ জানার কোন প্রভাব দেখা যায় না। বিষয়টি অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও প্রতিনিয়ত অবহেলিত ই থেকে যায়। এর কারণ হতে পারে বিষয়টি মোকাবিলায় আমাদের কার্যক্ষমতার সীমাবদ্ধতা।ভিটামিনের অভাবজনিত রোগগুলো শহরগুলো মাত্রাহীনভাবে ছড়িয়ে পড়ছে কিন্তু তারপর ও মানুষ সেগুলোর মূল কারণ উপেক্ষা করে চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছে ঔষধের জন্য যদিও তা শুধু ব্যয়বহুল ই নয় বরং কম কার্যকর ও বটে।

মাইক্রো ফ্র্যাঞ্চাইজিং তুলনামূলক নতুন হলেও সফল একটি উদ্যোগ হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। অন্য সকল ফ্র্যাঞ্চাইজির মতই এটির কার্যক্রম শুরু হয়, ধরা যাক, পিজা হাট। কিন্তু ব্যতিক্রম হচ্ছে, মাইক্রো ফ্র্যাঞ্চাইজি সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা করে। এই লেখায় আলোকপাত করা হবে এমনি একটি মাইক্রো ফ্র্যাঞ্চাইজির ওপর, যা বর্তমানে চলমান। কৃষি উৎস, কেয়ার বাংলাদেশ যার পথিকৃৎ। ঢাকা মহানগরীর অন্যান্য সামাজিক ব্যবসা সংস্থাগুলোর সাপেক্ষে কৃষি উৎস বৈচিত্রময় কারণ কোনপ্রকার অতিরিক্ত পদক্ষেপ ছাড়াই এটি ক্রমবিকাশমান এবং সামাজিক পরিবর্তনে এর প্রভাব পরিসংখ্যানের মাধ্যমে পরিমাণযোগ্য।

কৃষি উৎস একটি প্রতিষ্ঠানের নাম যার অধীনে উদ্যোক্তারা তাদের মালিকানা মূলধন এবং বিভিন্ন কাচা মাল যেমন কৃত্রিম বীজ, বীজ, গবাদি ঔষধ ইত্যাদি বিনিয়োগ করতে পারে সেই সকল চাষীর জন্যে যারা সীমাবদ্ধতার কারণে এই সকল দ্রব্যাদি সংগ্রহ করতে পারে না। পারলেও সেগুলো মানসম্মত নয়। এটি একটি মাইক্রো ফ্র্যাঞ্চাইজ মডেল যার সম্পর্কে ইতোমধ্যেই আমরা সূচনায় আলোচনা করেছি। প্রায়ই চাষীরা উন্নত মানের দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদন করতে পারে না তাদের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে। মূল্য তুলনামূলক বেশি হলে উন্নত পণ্যের চাহিদাও শহরাঞ্চলে তেমন থাকে না কারণ তারা রাসায়নিক পদার্থ অথবা ফরমালিন মিশ্রিত পণ্য বেশি কিনে থাকে যেহেতু সেগুলোর উৎপাদন ও ভোগ উভয়ই তুলনামূলক সহজ ও সাশ্রয়ী। কৃষি উৎসের কাজ প্রান্তিক পর্যায়ের উৎপাদকদের সাথে বিক্রয়কেন্দ্রগুলোর যোগসূত্র স্থাপন। এর মাধ্যমে বিক্রেতারা উন্নত ও খাঁটি দ্রব্য একই দামে বিক্রয় করতে পারে। প্রান্তিক উৎপাদকদের জন্যেও এটি উপকারী কারণ তারা এর মাধ্যমে সম্পূর্ণ নতুন একদল ক্রেতা পায় তাদের দ্রব্য বিক্রি করার জন্যে। সারা দেশে কৃষি উৎসের ৫০টির ও বেশি বিক্রয়কেন্দ্র আছে যার মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছে ২০ হাজারের ও অধিক চাষী, মুনাফার পরিমাণ শতকরা ৩৫ ভাগের বেশি। কৃষি উৎস তার প্রতিষ্ঠার প্রথম বছরেই পণ্য বিক্রয় করেছে ১৭ হাজার ডলারেরও বেশি মূল্যমানের।
কৃষি উৎসের মাধ্যমে উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ মুনাফা করে থাকে যার মূল কারণ ভেজালবিহীন উন্নত অথচ সাশ্রয়ী দ্রব্যের মাত্রাতিরিক্ত চাহিদা। কৃষি উৎসের সূচনা না হলে সারা ঢাকা শহর ঘুরেও ক্রেতারা হয়ত এমন পণ্যের দেখাও পেত না। কৃষি উৎসের মাধ্যমে উদ্যোক্তারা শুধু তাদের ব্যবসা ই দাঁড় করাচ্ছে না বরং মুনাফা করছে, বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যবসাকে সম্প্রসারণ করছে সারা দেশ জুড়ে এবং সবকিছু করছে পণ্যের গুণগত মান অক্ষুণ্ন রেখেই যদিও এসকল কিছুর পেছনে মূল কৃতিত্ব কেয়ার কে ই দিতে হবে। ব্যবসার প্রশাসনিক দিক সামলানোর পাশাপাশি কেয়ার ব্যবসার গতি প্রকৃতি, পণ্যের বাজার চাহিদা বিবেচনায় রেখে উৎপাদনকারীদের সাথে যোগাযোগ রেখে চলছে। এছাড়াও উদ্যোগের বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে গবেষণার ভিত্তিতে উন্নয়ন পর্যন্ত সবকিছুই এককভাবে কেয়ার দেখাশোনা করছে। এ উদ্যোগের সবচেয়ে বড় সাফল্য যে, চাষীরা ন্যায্য মূল্যের বিনিময়ে উন্নত ও ভেজালবিহীন দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদন করছে। এ সেবার মাধ্যমে শহরের ভোক্তাদের ভেজাল দ্রব্যের কারণে সৃষ্ট রোগব্যাধিতে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার খরচ বেঁচে যাচ্ছে।
কৃষি উৎস যথেষ্ট প্রতিশ্রুতিশীল একটি উদ্যোগ যার মাধ্যমে খাদ্যে বিষক্রিয়া রোধে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়। বর্তমানে যদিও এর কাজ শুধু দুগ্ধজাত পণ্যের বাজারেই সীমাবদ্ধ তথাপি কৃষির অন্যান্য ক্ষেত্রেও কৃষি উৎসের কার্যক্রম ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে ঢাকা মহানগরীকে বহুলাংশে খাদ্যে বিষক্রিয়ার ন্যায় মারণব্যাধী থেকে মুক্ত করা যাবে। কৃষি উৎসে প্রয়োগকৃত সকল বিনিয়োগের যেহেতু পরিমাণযোগ্যতা রয়েছে, বিনিয়োগকারীদের মুনাফা বা বিনিয়োগকৃত অর্থের পরিমাণ ছাড়াও তাদের সংখ্যা এবং আয় ব্যয়ের হিসেব রাখা সহজ ও কম সময়সাপেক্ষ। দুগ্ধজাত পণ্যের সম্মিলিত বাজারের মুনাফা বা গতিপ্রকৃতি ও এর মাধ্যমে নির্ণয় করা সহজতর। আশা করা যায়, ভবিষ্যতে কৃষি উৎসের গ্রাহকদের সংখ্যা থেকে আমরা সমগ্র নগরবাসীর স্বাস্থ্য এবং খাদ্য নিরাপত্তার সঠিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা করতে পারব। এছাড়াও, মাইক্রো ফ্র্যাঞ্চাইজিং এর মাধ্যমে ব্যবসায়িক দায়বদ্ধতা, নারী অধিকার থেকে শুরু করে শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করা অন্যান্য সামাজিক আন্দোলনের চাইতে অধিক কার্যকর। কৃষি উৎস কেবল একটি সামাজিক ও স্বাস্থ্যখাতে বিপ্লব ই নয় বরং দাতা এবং উদ্যোক্তাদের জন্যে আশীর্বাদস্বরূপ কারণ তারা তাদের বিনিয়োগের পরিমাণ ও তার ফলাফল পুংখানুপুংখুভাবে বিবেচনার মাধ্যমে অন্যান্য সামাজিক ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ ঘটাতে পারে।

চিত্র: Nayeema Mahfuja

Permalink to this discussion: http://urb.im/c1510
Permalink to this post: http://urb.im/ca1510dhb